আজ ১২ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

ভালোবাসা এক মহৎ গুন

একটি কাটা মাথা সি আই ডি প্রধানের টেবিলে ৩ টা জিনিস পড়ে আছে। একটা আমার লেখা কেইস ফাইল। একটা ডায়রি,যেটা আমি চুরি করেছি। আরেকটা কাটা মাথা,যেটা আমি বস্তায় করে নিয়ে এসে প্রচন্ড ক্ষোভে তার টেবিলে ছুড়ে মেরেছি। সি আই ডি প্রধান বড্ড দাপুটে,সরকারী দলের ছাত্রনেতা ছিল এক সময়,কোন কিছুকে কেয়ার করে না সে। এখন বুড়ো বয়সে একটু সভ্য ভদ্র সাজার চেষ্টা করলেও মাঝে মাঝে অধঃস্তনদের উপর ছোটলোকের মত খবরদারি করে।পান থেকে চুন খসলে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। আমি তো তার আন্ডারের একদম নতুন এক গোয়েন্দা মাত্র। তাও আবার সরকারি দল করি না,বাপ দাদা চৌদ্দগোষ্ঠিতে কেউই সরকারি দলটারে দুই চোখে দেখতে পারে না। তাও আবার টাকা দিয়ে আসি নি এই পোস্টে।নিজের যোগ্যতায় আসছি। লাখে একজন আমার মত ভাগ্য নিয়ে আসে এই বাংলাদেশে,যার প্রশাসন এর যেকোনো চাকরি বিনা ঘুষে,বিনা সুপারিশে হয়েছে। আমার উপর গোয়েন্দা প্রধানের রাগ কম নয় বই ই।আমার অস্তিত্বই তার অসহ্য লাগে। সরকারি দলরে প্রকাশ্যে ঘৃণা করি।তার ছাত্রসংগঠনরে ঘৃণা করি,তাও আমি টিকে আছি তেলাপোকার মত। তার মত শক্তিশালী এক কমান্ডারের রাগ তো হবারই কথা। কিন্তু আজ সে আমার দিকে চোখ গরম করে তাকাল প্রথমে,কিন্তু আমাকে তার দ্বিগুন চোখ বড় করে ফোঁসফোঁস শ্বাস ফেলতে দেখে চোখ নামিয়ে নিলেন। আমার হাত মুঠিতে শক্ত হয়ে পিষতে লাগল। আঙ্গুলের হাড় মটমট করতে লাগল। কাটা মাথাটা তখনো হা করে ভয়ংকর একটা আতংকিত দৃষ্টি নিয়ে টেবিলের উপর পড়ে আছে। দৃষ্টি আকাশের দিকে। আমি বললাম,,আপনি মানুষ না,আপনি জানোয়ার,আপনি একটা ছোটলোকের বাচ্চা,আপনি খারাপ আমি জানতাম,কিন্তু এতটা নিচে যে কোন মানুষ নামতে পারে,আমার জানা ছিল না,,ছিঃ। প্রতাপশালী সি আই ডি প্রধান আমার মত তেলাপোকার ভর্ৎসনাতে চোখ গরম আর দেখাল না।মাথা নিচু করে রইল। আমি বললাম,,এই কেইস ফাইল সি আই ডির ফাইলে যাবে না আমি জানি। কিন্তু মনে রাখবেন,আপনার উপর একটা অভিশাপ লাগল আজ। আপনি এ থেকে পালাতে পারবেন না। আমি হনহন করে বেরিয়ে গেলাম রুম দেখে,দরজা প্রচন্ড শব্দে ধাক্কা দিয়ে খুললাম,কাচ থরথর করে উঠল। আমার নীল শার্ট রক্তে পুরোটা লাল,আমার সহকর্মীরা আমাকে এখানে আসতে দেখে সেই বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল,বের হবার সময়েও একই বিস্ময়ে আমি তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম।

২. ফ্ল্যাশব্যাক যখন আমি আমার ফ্লাটে চলে আসলাম,অন্ধকার ফ্লাটে আমার বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়ার পর অবশেষে আমার রাগটা ভাঙল। রাগের চিরাচরিত নিয়ম হল রাগ কখনো জায়গা ফাকা রেখে চলে যায় না। রাগের জায়গায় দুঃখ এসে ভরিয়ে দেয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হল। প্রচণ্ড দুঃখে বুকটা হাহাকার করে উঠল। এই কেইসটা আমাকে দেওয়া হয়েছিল আমার প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষ থেকে। নইলে আমার মত আনকোরা একজন সি আই ডি অফিসারকে তার ক্যারিয়ারের প্রথম কেইসটাই এত ভয়ংকর আর অভেদ্য হয় না। কেইসটা ছিল ১৩ টা বীভৎস খুনের। সুন্দরবনের একটা গেস্ট হাউসে ১৩ টা মানুষকে একটা মানুষখেকো বাঘ নাকি খেয়েছে। প্রত্যেকবারই অর্ধেক খাওয়া লাশ পাওয়া গেছে জঙ্গলের মধ্যে। রাত বিরেতে বাঘ নাকি আসে গেস্ট হাউজে,লোকগুলোকে নিঃশব্দে ধরে নিয়ে যায়। মানুষখেকো বাঘ নিয়ে যখন সারা বাংলাদেশ সরগরম হয়ে আছে,সরকারিভাবে বাঘটাকে মারতে শিকারি পাঠানো হল। শিকারিরা পুরো জঙ্গল সার্চ করে অনেক বাঘই পেল বটে কিন্তু অভিজ্ঞতা দিয়ে বলল এই বাঘগুলোর কেউই মানুষখেকো না। মানুষখেকো বাঘটাকে কেউ কখনো দেখে নি। জাস্ট খাওয়া লাশ দেখে ধারণা করেছে মাত্র এটা বাঘের কাজ। এর মধ্যেই বাধ সাধল সি আই ডির নতুন ফরেনসিক এক্সপার্ট ডাক্তার রেহানা। তিনি সর্বশেষ লাশের ক্ষত পরীক্ষা করে দেখলেন তাতে বাঘের কামড়ের কোন চিহ্নই নেই,বাঘ কেন,কোন পশুর কামড়েরই চিহ্ন নেই। উলটা একটা ক্ষত পাওয়া গেল বীভৎস ক্ষতগুলোর মাঝে,যেটা দেখে উনি সিদ্ধান্তে আসলেন যে এইটা বাঘের কাজ না। কোন মানুষের কাজ। যারই কাজ সে অনেক সময় নিয়ে লাশটাকে ধারাল কিছু দিয়ে পোচিয়ে বাঘের অর্ধভুক্ত দেহ হিসেবে চালানোর চেষ্টা করেছে,লাশের বাকি অংশ সে কি করেছে সেটা ডাক্তার বলতে পারলেন না।এই সন্দেহের পর ডাক্তার সি আই ডির মর্গে থাকা এখনো পরিচয় পাওয়া যায় নি এমন ৩/৪ টা লাশ আবার পরীক্ষা করেও সেই জিনিস দেখতে পেলেন। ডাক্তারের কাছ থেকে এই বিবৃতি পেয়ে সাথে সাথে সি আই ডি প্রধান আমাকে দায়িত্ব দিলেন এই খুনিকে বের করতে সুন্দরবন যেতে। কেইস নেওয়ার সময় তার সে বাকা হাসিটা আমি কখনো ভুলব না। আমি কেইস নিয়ে আমার কাজ বুঝে নিয়ে ব্যাগ গোছাতে আসলাম আমার ফ্লাটে। তখনই আমার মোবাইলে একটা ফোন আসল,ফোনটা করেছে সি আই ডি প্রধান। আমি তাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি করতে হবে। সে আমাকে টিটকারি দিয়ে বলল,,উপরে ব্রিফ করার পর আমাকে বলা হল একটা এমেচিউরকে যেন একা কেইসটা না দেওয়া হয়। তাই আমি তোমার সাথে এক সিনিয়রকে পাঠাব। উনি আমাদের প্রাক্তন ফরেনসিক স্পেশালিষ্ট ডাঃ রকিব হাসান,কিন্তু শখের গোয়েন্দা হওয়ায় উনি ফরেনসিক এর কাজটা বেশিদিন চালায় নি। উনি নিজের একটা ডিটেক্টিভ এজেন্সি খোলেন। কিন্তু সেটার লাইসেন্স পেতে আমরা তাকে শর্ত দিয়েছিলাম আমাদের কেইসে মাঝেমাঝে তাকে তলব করা হবে। যেহেতু এটা একটা জটিল কেইস,আর ওনার খুব সুখ্যাতি আছে এসব কেইস সলভ করার। তাই আমি তোমাকে ওনার আন্ডারে দিলাম এই কেইস। তোমার দায়িত্ব ওনাকে সাহায্য করা,আর আমাকে একটা ফুল কেইস ফাইল দেওয়া। আমি অবাক হলাম।আমার ভাগ্য হঠাৎ এত ভাল হবে কেন? সি আই ডি প্রধান আমাকে দেখতে পারে না। সে আমার প্রাণ যেতে পারে এমন একটা কেইসে অবশেষে আমার জন্য হেল্প পাঠাল কেন? অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে লাগল। জবাব পেলাম না। ব্যাগ নিয়ে অবশেষে গেলাম আমি সুন্দরবনের সেই গেস্ট হাউজে।

সুন্দরবনের গেস্ট হাউজে আমি আমার নির্দিষ্ট রুমে গিয়ে উঠলাম। হঠাৎ রাতের বেলা লাগেজ টানার শব্দ পেলাম।আরেকটা মানুষের পায়ের শব্দ। আমি পিস্তল হাতে রেডি হলাম। দরজা একটু ফাকা করে দেখতে লাগলাম।কিন্তু শেষ যেটা দেখলাম সেটা হল একটা লাগেজ ট্রলি ঢুকে গেল পাশের রুমটায়।পরেরদিন সকালে আমি ব্রেকফাস্ট করতে বের হলাম। এই গেস্টহাউজের কিচেনেই।বনমুরগির মাংসের রোস্ট আর চাপাতি। খেতে খেতে বাইরের প্রকৃতি দেখতে লাগলাম। অসাধারণ প্রকৃতি। আল্লাহ যেন দুনিয়ার সব সৌন্দর্য সুন্দরবনের এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দিয়েছে। নির্মল,শান্ত,রহস্যময় এ বন। কিন্তু এরই মাঝে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর বিভীষিকা। ঠিক যেন মেয়েদের রূপের মত। চোখ ফেরানো যায় না সে মমতাময় মুখচ্ছবি থেকে,কিন্তু আড়ালে তার ডাইনি হাসে।গেস্ট হাউজে মানুষখেকো বাঘের কথা শুনে কোন ট্যুরিস্ট ওঠে নি। গেস্টহাউজের ম্যানেজার একা থাকে ৩ তলায়,তার ফ্যামিলি থাকে খুলনার মেইন শহরে। একজন কেয়ারটেকার,কাম চৌকিদার, কাম রাধুনি আছে এখানে,নাম সোহরাব মিয়া।একসাথে৩ কাজ তার করতে হচ্ছে। সে মূলত রাধুনি,কিন্তু এর আগের কেয়ারটেকার আর চৌকিদারলে বাঘে নিয়ে যাওয়ায় তার ঘারেই পড়েছে দায়িত্ব। তার ছেলে ১০ বছরে আবুল ফাই ফরমাশখাটে গেস্ট হাউজের।ওর মা নাকি ওকে জন্ম দিয়েই মরে গেছে। আবুলের শৈশব আর নেই,মুখে শিশুর সে সরলতাটাও আর নেই। মুখে বড়দের মত সংকল্পের একটা ভাব ফুটে উঠেছে।তার বাবাকে সাহায্য করার,বাপ ছেলের সংসারে বাড়তি টাকা আয়ের জন্য। ওই ছেলেই নাকি বনের ভিতরে গিয়ে গেস্টদের জন্য বনমুরগি, ঘুঘু বক এসব পাখি মেরে আনে।আমি ওকে বললাম,,কিরে আবুল, একা বনের ভিতরে যাস,ভয় করে না? আবুল লজ্জা পেয়ে একটা হাসি দিয়ে দুই প্লেট বনমুরগির রোস্ট আর চাপাতি নিয়ে চলে গেল। আমি সোহরাব মিয়াকে বললাম,,দুই প্লেট নিয়ে ও কই যায়? সোহরাব বলল,,কালকে রাতে গেস্ট আচ্ছে। সেই সাহেব ভোরে এসে আমাকে বলল,তার আর তার বউয়ের জন্য খাবার পাঠাতে। আমি বললাম,,এই মানুষখেকো বাঘের সময় গেস্ট আসছে? তারা জানে না? টিভিতে তো সরকারিভাবে সব চ্যানেলে বলে দেওয়া হয়েছে,সুন্দরবন ট্যুর আপাতত নিষিদ্ধ। সোহরাব বলল,,আমি ওনাকে বলছিলাম। উনি বলল,উনি আর ওনার বউ নাকি এই বাঘ ধরতেই আসছে। আমি অবাক হয়ে আমার নাস্তা শেষ করলাম।নাস্তা শেষ করে রেস্টরুমে বসলাম। টিভি চলছে। আমি সুন্দরবনের এই এলাকার একটা ম্যাপ এনেছিলাম। আগের ১৩ টা লাশ কোথায় পাওয়া গেছে পেন্সিল দিয়ে সেই জায়গায় দাগ দিয়ে রাখছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলল, এই ৭ নম্বরটা এখানে পাওয়া যায় নি,আপনি যে জায়গাটা দাগিয়েছেন ওটা একটা নদী। এই হত্যাগুলোর ইউনিক পয়েন্ট হচ্ছে কোনটাই নদীর আশেপাশে করা হয় নি বা লাশ ফেলা হয় নি। আমি ঘুরে তাকালাম। দেখলাম একটা ত্রিশোর্ধ লোক আমার দিক তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সে আমাকে বলল,,আমি রকিব হাসান,প্রাইভেট ডিটেক্টিভ। আপনি নিশ্চয়ই রায়হান মাসুদ? সি আই ডি অফিসার? আপনার সম্পর্কে আমাকে বলা হয়েছে। আমি ওনাকে সালাম দিয়ে বললাম,,,হ্যা,আমাকেও বলা হয়েছে আপনাকে নাকি ডাকা হয়েছে,কারণ আপনাকে জটিল অভেদ্য কেইস গুলোতে নাকি সি আই ডি ডাকে। রকিব বলল,,আমাকে না,বলুন আমাদেরকে। আমি আর আমার স্ত্রী দিনাকে। আমরা প্রাইভেট একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুলেছিলাম। মোটামুটি জনপ্রিয় এটা।নিজের ঢোল নিজেই পিটালাম। আমি বললাম,,আপনার ওয়াইফও এসেছে এখানে?

রকিব বলল,,অফ কোর্স। দিনা কি আমাকে একা ছাড়ে কখনো? আমি তো কখন কোথায় কি বলি নিজেও জানি না। একবার ভুলে খুনি ধরতে গিয়ে খুনিকেই আমার প্লান নলে দিয়েছিলাম। দিনা ম্যানেজ করেছিল পরে। ও মার্শাল আর্টও জানে। কালকে সি আই ডি প্রধান আমাকে যখন ফোন দিল এই কেইসটার ব্যাপারে হেল্প চেয়ে, ভয়াবহ কেইস বলে দিনা সবার আগে আমার সাথে ওর কাপড় চোপড়ও প্যাক করল,হা হা হা। আমি বললাম,, কোথায় উনি? রকিব বলল,,জার্নি করে ক্লান্ত বুঝলেন। একবার একটা সাইকো খুনি ধরতে গিয়ে খুব ইঞ্জুরড হয়েছিল। আমাদের বাচ্চাটা আর পৃথিবীতে আসে নি। এর পর থেকে প্রায়ই দুর্বল থাকে।তাও আমাকে সে এওয়া আসতে দেবে না,বুঝুন ব্যাপারটা,,হা হা হা। আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। লোকটা অনেক মিশুক। সহজেই সবাইকে বিশ্বাস করে ফেলে। টিপিক্যাল বাংলাদেশিদের মত। এই লোক এত বড় গোয়েন্দা? নাহ সাহিত্যের কোন বড় গোয়েন্দা চরিত্রের সাথে মিল পাই না। আমি বললাম,,তো আমরা শুরু করি এই কেইস নিয়ে আলোচনা? নাকি ভাবীর জন্য অপেক্ষা করব? রকিব বলল,,রায়হান,আপনি জানেন? আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে খুন হতে? সবার ধারণা,আপনি আর বেচে ফিরবেন না এখান থেকে,,, আমি প্রচণ্ড চমকে উঠলাম। কি বলে এই লোক? রকিব হাসি হাসি মুখেই বলল,আমি সি আই ডি প্রধানের গতিবিধি হাড়েহাড়ে চিনি। সে আপনাকে দুই চোখে দেখতে পারে না। সে ভাল করেই জানে এটা একটা নৃশংস সাইকোর কাজ। এই সাইকো ধরতে মিনিমাম ১০ জনের সশস্ত্র আর অভিজ্ঞ টিম লাগবে। সেখানে সে শুধু আপনাকে পাঠিয়েছে। সে আপনাকে দুই চোখে দেখতে পারে না। আমি ওনার দিক হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকলাম। উনি বলতে থাকলেন, ভাবছেন আমি কিভাবে জানি? আমি আপনার সম্পর্কে খোজ নিয়েছি। মিনোলজি সাব্জেক্টে সারা বাংলাদেশে প্রথম,পুলিশ ট্রেনিং এ প্রথম,একদম আন্তর্জাতিক লেভেলের পার্ফরমেন্স।

৪ responses to “ভালোবাসা এক মহৎ গুন”

Leave a Reply

     এই বিভাগের আরো সংবাদ