আজ ২৭শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১১ই আগস্ট, ২০২০ ইং

এই ঈদে কামারদের নেই তেমন টুং টাং শব্দ!

মোহাম্মদ মনির:

কামাররা এখন লোহার হাতুড়ির টুং টাং শব্দে মূখর থাকার কথা। কারণ আর কয়েকদিন পরেই পবিত্র ঈদুল আজহা। তাই পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে কর্ণফুলী উপজেলার কামাররা এখন ব্যস্ত সময় পার করার কথা থাকলেও নেই তেমন ব্যস্ততা। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, ফাজিল খাঁর হাট, জামতল বাজার, মিয়ার হাট, বাংলা বাজার, ক্রসিং, মইজ্জ্যারটেক, মাস্টার হাট বাজারসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার ছোট-বড় সব হাট-বাজারে কামাররা এখন অলস সময় পার করছেন।
হাতুড়ি পেটানো টুং টাং শব্দে এখন আর তেমন শোনা যায় না কামারপাড়ায়। মহামারি করোনা প্রকোপ থাকার কারনে দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষদের জীবন পরিচালনা করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণঘাতি এই করোনাভাইরাস এক নিমিষে বদলে দিয়েছে মানুষের গতিপ্রকৃতি।করোনাভাইরাস যেমন পুরোবিশ্বকে গ্রাস করে আছে, বন্ধ করে দিয়েছে মানুষের স্বাধীনতা আর তখনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় আম্পান পাল্টে দিয়েছে তাদের দৈনন্দিক জীবনধারাকে। জীবন কেড়ে নেওয়া করোনাভাইরাস ও পথে বসিয়ে দেওয়া ঘূর্ণিঝড় আম্পান এরমধ্যে চলে আসেছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় খুশির দিন ঈদ-উল আযহা।মর্মান্তিক এই পরিবেশে কারো মুখে খুশির আবছায়া নেই। আর নেই কামারদের সেই ঠুক-ঠাক শব্দ। মনে হয় এক নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেছে কামাররা, বাতাসে হারিয়ে গেছে লোহার দা, ছুরি, চাকু, কোদাল, চাপাতি ইত্যাদি এইসব জিনিসপত্র বানানোর সময় সেই ঠুক-ঠাক শব্দটি।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার বাজারগুলো নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই আবার এই পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশাকে বেছে নিয়েছে। বর্তমানে কামারদের ঈদ উপলক্ষে নেই তেমন কোন কাজ, নেই কোন শব্দ। গতবছর ঈদ-উল আযহা আসার প্রায় ১ থেকে দেড় মাস আগে থেকে কামারপাড়া এলাকাটি প্রায় দিন-রাত ২৪ ঘন্টায় এক অদ্ভুদ তরঙ্গে সময় কাটাতো। এমনকি কামাররা দুবেলা খাওয়ারও সময় পেত না। কিন্তু মরণব্যাধী করোনভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যে উপজেলার বেশিরভাগ মানুষ কোন পশু কোরবানী দিচ্ছে না।

কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা বলেন, আমাদের বাপ দাদা সকলে এই কাজ করে আসছে। আর আমরা বংশ্বধর হওয়ায় নিজেদের এই বংশ পরস্পরা এগিয়ে নেওয়ার জন্য ছোটবেলা থেকে আমরা এই কাজ করে আসছি। রাত দিন ২৪ ঘন্টায় চলে লোহার ঠুক-ঠাক শব্দ। কিন্তু এ বছর সেই ব্যস্ততা, ঠুক-ঠাক শব্দ আর নেই। করোনায় তাদের মুখের হাসিও ফুরিয়ে গেছে। অথচ সারা বছরের ধার-দেনা পরিশোধের সময়টাতেই আজ তারা অলস সময় পার করছেন। এতে তাদের ধার-দেনা কমার পরিবর্তে দেনার পরিধি আরো বাড়ছে।

আরো বলেন, আধুনিক যন্ত্রাংশের প্রভাবে কামার শিল্পের দুর্দিন চললেও প্রতি বছরই কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে জমে উঠতো এ শিল্প। তাই তো আমরা প্রতিবছরই কোরবানীর এই সময়টার অপেক্ষায় থাকি। কারণ এই সময়ে সারা বছরের ধার-দেনার পরিশেধের সুযোগ থাকে। কিন্তু এবার করোনায় আমাদের সব আশা শেষ হয়ে গেছে।

কারিগর সোনা বলেন, প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে এই পেশায় আছি। প্রতি বছর এই সময়টায় অনেক ব্যস্ত থাকি। যত দিন গড়াবে ব্যস্ততা বাড়বে। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত। ঈদের আগের দিনে অনেক অর্ডার ফেরত দিতে হয়। ঈদের আগের রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করতে করতে সকাল হয়ে যায়। কিন্তু এখন করোনা সব থামিয়ে দিয়েছে।

রঞ্জিত কর্মকার জানান, কোরবানির সামগ্রী তৈরীর কাঁচা মালসহ কয়লা ও রেতের দাম বেড়েছে। তেমন চাহিদা না থাকায় এসব পন্য তারা সীমিত লাভে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এখানে ১শ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় হাজার টাকার বিভিন্ন কোরবাণির সামগ্রী রয়েছে। ধার-দেনা করে ব্যবসা ধরে রাখলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারি সহায়তার দাবী জানিয়েছেন তিনি। করোনার প্রভাবে রোজগার কমে যাওয়ায় নিজের পরিবারের ভরণ পাশাপাশি কারিগরদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

Comments are closed.

     এই বিভাগের আরো সংবাদ